বোরো ধান আবাদ কলা-কৌশল ও পদ্ধতি এবং বোরো ধান চাষাবাদে কৃষক ভাইদের করণীয়
কৃষক পর্যায়ে উফশী বোরো ধানের ফলন হেক্টর প্রতি ৪ থেকে ৮.৫ টন । যথাযথ চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে গড় ফলন হেক্টর প্রতি ১.৫ থেকে ২ টন বাড়ানো সম্ভব যা জাতীয় দানাদার ফসল উৎপাদনে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
বোরো চাষে করণীয়-
জাত নির্বাচনঃ
কৃষি পরিবেশ ও ভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জাত নির্বাচন করতে হবে;
দীর্ঘমেয়াদি জাত: (জীবনকাল ১৫০ দিনের বেশি)- যেমন- বিআর ১৪, বিআর ১৬, ব্রিধান ২৯, ব্রি ধান ৫৮, ব্রি ধান ৫৯ ও ব্রি ধান ৬০;
স্বল্পমেয়াদি জাত: ( জীবনকাল ১৫০ দিনের কম )- যেমন- ব্রি ধান ২৮ , ব্রি ধান ৪৫, ব্রি ধান ৫৫, ব্রি ধান ৭৪,,ব্রি ধান ৮১, ব্রি হাইব্রিড ধান ২, ব্রি হাইব্রিড ৩, ব্রি হাইব্রিড ধান ৫;
লবণাক্ত
এলাকার জন্য জাত: ( জীবনকাল ১৪৫-১৫০
দিন)- যেমন – ব্রি ধান ৪৭ এবং ব্রি ধান ৬৭।
বীজতলা
তৈরিঃ
চারা তৈরির ক্ষেত্রে আদর্শ বীজতলা ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে শীতপ্রবণ
এলাকায় শুকনা বীজতলা এবং অন্যান্য এলাকায় ভেজা বীজতলা তৈরি করা যায়।
বীজ বপন ও চারা রোপনঃ
·
সারা দেশে অনুকূল পরিবেশে স্বল্পমেয়াদি জাতের বপন সময় ১৫ থেকে
৩০ নভেম্বর এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতের বপন সময় ১ থেকে ১৫ নভেম্বর ;
· হাওর অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি জাতের বপন সময় ১৫ থেকে ২১ নভেম্বর ও দীর্ঘমেয়াদি জাতের বপন ১ থেকে ৭ নভেম্বর;
· ঠান্ডাপ্রবণ অঞ্চলে ও জলাবদ্ধ এলাকায় স্বল্পমেয়াদি জাতের বপন সময় ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতের বপন সময় ১ থেকে ১৫ নভেম্বর;
· লবণাক্ত এলাকায় স্বল্পমেয়াদি জাতের বপন সময় ১ থেকে ১৫ নভেম্বর;
· ব্রাউশ চাষাবাদে স্বল্পমেয়াদি জাতের বপন ১৫ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারী ;
· স্বল্পমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে চারার বয়স হবে ৩৫ থেকে ৪০ দিন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৪৫ দিন;
· ধান রোপনের উপযুক্ত সময় ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারি এবং রোপন দূরত্ব ২০*২০ সেন্টিমিটার;
· ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন করলে রোপনের তুলনায় ধান ৭ থেকে ১০ দিন আগে পাকে।
·
চারার সংখ্যাঃ
প্রতি গুছিতে একটি করে সতেজ চারা রোপন করাই যথেষ্ট, তবে বৈরী পরিবেশে (শীত
ও লবণাক্ততা) প্রয়োজনে এক গুছিতে ২টি থেকে ৩টি চারা রোপন করা যায়।
আগাছা দমনঃ
*কাঙ্খিত ফলন পেতে হলে চারা রোপনের ৪৫ দিন পর্যন্ত জমি আগাছামুক্ত রাখা
আবশ্যক। হাত দিয়ে/উইডার (নিড়ানি যন্ত্র ) দিয়ে এবং আগাছানাশক ব্যবহার করে ধানের আগাছা
দমন করা যায়।
পানি ব্যবস্থাপনাঃ
*ধানের চারা রোপনের পর জমিতে ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত ছিপছিপে পানি রাখতে হবে;
*পানি সাশ্রয়ের জন্য এডব্লিউডি পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়;
*যদি চারা রোপনের পরে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয় তাহলে ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার দাঁড়ানো পানি ধরে রাখতে হবে;
*ধানগাছের প্রজনন পর্যায়ে জমিতে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার পানি থাকা আবশ্যক।
সার ব্যবস্থাপনাঃ
*মাটির উর্বরতা, ধানের জাত, জীবনকাল ও ফলন মাত্রার ওপর ভিত্তি করে সারের মাত্রা নির্ধারন করতে হবে। তবে মাটি পরীক্ষা করে সারের মাত্রা নির্ধারিত করা সর্বোত্তম উপায়।
*স্বল্পমেয়াদি জাতের জন্য সারের মাত্রা- বিঘাপ্রতি ইউরিয়া-৩৫, ডিএপি/টিএসপি-১২, এমওপি-২০, জিপসাম-১৫ ও দস্তা ১.৫ কেজি;
দীর্ঘমেয়াদি জাতের জন্য সারের মাত্রা- ইউরিয়া -৪০, ডিএপি/টিএসপি-১৩, এমওপি ২২, জিপসাম-১৫ ও দস্তা ১.৫ কেজি। হাওর অঞ্চলের জন্য ইউরিয়া -২৭, ডিএপি/টিএসপি- ১২, এমওপি-২২, জিপসাম-৮ ও দস্তা ১.৫ কেজি;
*ডিএপি/টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও দস্তা সার পুরাটাই শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে।
*এমওপি সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি অর্ধেক/দুই তৃতীয়াংশ সার জমি প্রস্তুতের
সময় ও বাকি অর্ধেক/এক তৃতীয়াংশ সার ২য়/৩য় কিস্তি ইউরিয়ার সাথে প্রয়োগ করা হয়। তবে ধানে
পোকামাকড় ও রোগবালাই কম হয় এবং ধানের দানা পুষ্ট হয় ও ফলন বাড়ে।
ডিএপি সার প্রয়োগ করলে বিঘা প্রতি
৫ কেজি ইউরিয়া সার কম দিতে হবে।
*স্বল্পমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া সার চারা রোপনের ১৫ থেকে ২০দিন পর, এক তৃতীয়াংশ ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর এবং এক তৃতীংশ কাইচথোড় আসার ৫ থেকে ৭ দিন আগে প্রয়োগ করতে হবে।
*দীর্ঘমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া সার শেষ চাষের সময় (অনুর্বর জমিতে), ১৫ থেকে ২০দিন পর (উর্বর জমিতে), এক তৃতীয়াংশ ১ম কিস্তির ২০ থেকে ২৫ দিন পর এবং এক তৃতীয়াংশ কাইচথোড় আসার ৫ থেকে ৭দিন আগে প্রয়োগ করতে হবে।
*দানাদার ইউরিয়া সার প্রয়োগযন্ত্র দিয়ে মাটির নিচে প্রয়োগ করা যায়। এতে ৩০ ভাগ ইউরিয়া সার সাশ্রয় হয় এবং ফলনের তারতম্য হয় না।
রোগ
দমনঃ
বাকানি রোগ দমনের জন্য ছত্রাকনাশক যেমন- অটোস্টিন বা নোইন দিয়ে বীজ বা চারা শোধন করতে হবে (৩ গ্রাম ছত্রাকনাশক ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে তাতে ১২ ঘন্টা বীজ ডুবিয়ে রাখা)। বীজতলায় অথবা যান্ত্রিকভাবে রোপনের জন্য ট্র্রেতে চারা তৈরি করার ক্ষেত্রে চারা ঝলসানো রোগ দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ২ থেকে ৩ মিনিলিটার এজোক্মিস্ট্রবিন অথবা পাইরাক্লোস্ট্রবিন ছত্রাক মিশিয়ে ১৮ থেকে ২০ ঘন্টা বীজ শোধন করা অথবা বীজতলা/ ট্রের চারায় স্প্রে করা।
*বোরো মৌসুমে ধানের শীষ ব্লাস্ট রোগ দেখা দেয়ার আগেই অনুমোদিত ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন- ট্রুপার, ডিফা হেষ্টর প্রতি ৪০০ গ্রাম অথবা স্ট্রাবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন – নেটিভো, ম্যাকটিভো হেষ্টর প্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম ধানের শীষ বের হওয়ার সাথে সাথে বিকালে ৫ থেকে ৭ দিনের ব্যবধানে দুইবার স্প্রে করতে হবে। ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ দেখা দিলে ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ৬০ গ্রাম পটাশ সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি 5 শতাংশ জমিতে ৭ থেকে ১০ দিন পরপর দুইবার স্প্রে করতে হবে। জমি পর্যায়ক্রমে শুকানো ও ভিজানো পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। থোড় অবস্থায় এ রোগ দেখা দিলে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে।
পোকামাকড় দমনঃ
*মাজরা পোকা দমনের জন্য ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে। আক্রমনের ফলে জমিতে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মরা ডিগ বা ৫ শতাংশ সাদা শীষ দেখা দিলে ভির্তারেকো ৪০ ডব্লিউজি বা অন্য কোনো অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। বাদামি ও সাদাপিঠ গাছফড়িং দমনে জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। এছাড়া জমিতে পোকার আক্রমণ বেশি হলে প্লিনাম ৫০ ডব্লিউজি, মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি বা অন্য কোনো অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
*মাজরা পোকা, বাদামি ও সাদাপিঠ ও পাতা মোড়ানো পোকা দমনের জন্য আলোক ফাঁদ এবং পার্চিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
*পাতা মোড়ানো পোকা আক্রমন বেশি হলে সেভিন ৮৫ ডব্লিউপি, সিনারিল বা অন্য কোনো অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া আক্রমণ বেশি হলে ফাইফানন ৫৭ ইসি, সেভিন ৮৫ ডব্লি কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
ফসল কাটা , প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণঃ
*মাঠে শতকরা ৮০ ভাগ ধান পেকে গেলে ধান কাটা নিরাপদ;
*রিপার দিয়ে ঘন্টার ১ বিঘা জমির ধান কাটা যাবে । এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। মাঠে মাড়াইযন্ত্র বা ক্লোজ ড্রাম থ্রেসার দিয়ে ধান মাড়াই করলে ২ থেক ৩ ভাগ বেশি ধান পাওয়া যাবে। জমির ধরন ও মেশিন যাতায়াতের সুবিধার ওপর নির্ভর করে কম্বাইন হার্ভেস্টার দিয়ে ধান কাটা , মাড়াই , ঝাড়াই ও বস্তার ভরা একই সাথে সম্পন্ন করা যায়।
পরামর্শঃ
