বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর ব্রি ১০৫ ধানের (বোরো ধান) জাত পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও চাষাবাদ কৌশল এবং ডায়াবেটিক নিরসনে কৃষক ভাইদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বোরো ধানের জাতঃ ব্রি
ধান ১০৫ (সমৃদ্ধির জন্য ধান)
জাত পরিচিতিঃ
ব্রি ধান ১০৫ একটি উচ্চ ফলনশীল স্বল্প গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) সম্পন্ন সারা দেশের চাষাবাদ উপযোগী বোরো মৌসুমের একটি জাত। জাতটির কৌলিক সারি বিআরসি ২৬৬-৫-১-১-১। উক্ত কৌলিক সারিটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আঞ্চলিক কার্যালয়, কুমিল্লায় বিআর ১৬ এর সাথে ৯০০৬০-টিআর ১২৫২-৮-২-১ এর ২০০৬ সালে সংকরায়ণ করে বংশানুক্রম
সিলেকশন (Pedigree Selection) এর মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়। ব্রি কুমিল্লার গবেষণা মাঠে হোমোজাইগাস কৌলিক সারিটি নির্বাচন করা হয় এবং পরবর্তীতে ব্রি কুমিল্লা হতে ব্রি গাজীপুরে নির্বাচিত হোমোজাইগাস কৌলিক সারিটি স্থানান্তর করে ৫ বৎসর ফলন পরীক্ষার পর ২০১৭ সালে ব্রি'র আঞ্চলিক কার্যালয় সমূহের গবেষণা মাঠে ও ২০১৮ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের মাঠে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। অতঃপর ২০২০ সালে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী কর্তৃক স্থাপিত প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষার (পিভিটি) পর ফলাফল বিশ্লেষণ করে জাতীয় বীজ বোর্ডের কারিগরী কমিটির সভায় পুনঃ মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অতঃপর ২০২১ সালে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী কর্তৃক স্থাপিত পিভিটি পরীক্ষায় সন্তোষজনক হওয়ায় ২ মার্চ ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১০৯তম সভায় এ জাতটি লো জিআই সমৃদ্ধ বোরো মওসুমের উচ্চ ফলনশীল জাত হিসাবে দেশজুড়ে চাষাবাদের। জন্য অবমুক্ত করা হয়।
জাতের বৈশিষ্ট্য
১। আধুনিক উফশী ধানের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
২। ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা এবং পাতার রং সবুজ।
৩। পূর্ণ বয়স্ক গাছের উচ্চতা ১০১ সে.মি.।
৪। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন ১৯.৪ গ্রাম।
৫। ধানের দানার রং খড়ের মতো।
৬। চাল মাঝারি চিকন এবং রং সাদা।
৭। এ ধানের জিআই এর মান ৫৫।
৮। চালে অ্যামাইলোজ এর পরিমাণ ২৭% এবং ভাত ঝরঝরে।
৯। চালে প্রোটিন এর পরিমাণ ৭.৩%।
এ জাতের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা
ব্রি ধান ১০৫ এর জীবনকাল ব্রি ধান ৫৮ এর প্রায় সমান। এ ধানের গুনগত মান ভাল অর্থাৎ চালের আকৃতি মাঝারি চিকন। প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষায় পাঁচটি অঞ্চলে ব্রি ধান ১০৫ এর ফলন চেক জাত ব্রি ধান৫৮ এর চেয়ে প্রায় ৮.৩৯% বেশী পাওয়া যায়। এ ধানের গুনগতমান ভাল। এ ধানের জিআই এর মান ৫৫ হওয়ায় এ জাতকে লো জিআই রাইস বা ডায়াবেটিক রাইস বলা যায়। এ জাতের হেক্টরে গড় ফলন ৭.৬ টন।
জীবনকাল: জাতটির গড় জীবনকাল ১৪৮ দিন।
ফলন: ব্রি ধান১০৫ এর গড় ফলন ৭.৬ টন/হেক্টর। উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে অনুকূল পরিবেশে হেক্টর প্রতি ৮.৫ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।
চাষাবাদ পদ্ধতি
ব্রি ধান ১০৫ বোরো মৌসুমে দেশের প্রায় সব জেলায় চাষাবাদ উপযোগী। এ ধানের চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী বোরো জাতের মতোই।
১. বীজ তলায় বীজ বপন: ০১-২০ অগ্রহায়ণ পর্যন্ত অর্থাৎ (১৫ নভেম্বর থেকে ০৪ ডিসেম্বর)।
২. চারার বয়স: ৩৫-৪০ দিন।
৩. রোপণ দুরত্ব: ২০ সে.মি × ১৫ সে.মি অথবা ২৫সে.মি থেকে ১৫সে.মি
৪. চারার সংখ্যা: গোছা প্রতি ২-৩টি।
৫. সার ব্যবস্থাপনা (কেজি/বিঘা): সারের মাত্রা অন্যান্য উফশী জাতের মতই।
৫.১
|
ইউরিয়া |
টিএসপি/ডিএপি |
এমওপি |
জিপসাম |
জিংক |
|
৪০ |
১৩ |
২২ |
১৫ |
১.৫ |
৫.২ সর্বশেষ জমি চাষের সময় তিন কিস্তি ইউরিয়া সারের প্রথম কিস্তি, সবটুকু টিএসপি, এমপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করা উচিত। ইউরিয়া সারের ২য় কিস্তি রোপনের ২০-২৫ দিন পর অর্থাৎ গোছায় কৃশি দেখা দিলে এবং ৩য় কিস্তি রোপনের ৪৫-৫০ দিন পর অর্থাৎ কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে। জিংকের অভাব পরিলক্ষিত
হলে জিংক সালফেট এবং সালফারের অভাব পরিলক্ষিত হলে
জিপসাম ইউরিয়ার মত উপরি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
৬. রোগ বালাই ও পোকামাকড় দমন: ব্রি ধান১০৫ এ রোগ বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে অনেক কম হয়। এ জাতটি ব্যাকটেরিয়াজনিত পোড়া রোগ প্রতিরোধী, তবে অন্যান্য রোগবালাই ও পোকা মাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করা উচিত।
৭. আগাছা দমন: রোপণের পর অন্তত ৪০-৫০ দিন পর্যন্ত জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
৮. সেচ ব্যবস্থাপনা: রোপণের পর থেকে দুধ আসা পর্যায় পর্যন্ত জমিতে যথেষ্ট পরিমানে রস থাকা প্রয়োজন। এ সময় খরা দেখা দিলে সম্পূরক সেচ দিতে হবে।
৯. ফসল কাটা: ধান কাটার উপযুক্ত সময় হলো ১৫-২৫ বৈশাখ অর্থাৎ ২৮ এপ্রিল-০৮ মে। শীষের শতকরা ৮০ ভাগ
কৃষক কেন ব্রি ধান ১০৫ চাষাবাদ করবেন?
আমরা জানি, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য লাল চাল, ব্রাউন রাইস, বাসমতি চাল, এবং বিশেষ উদ্ভাবিত ‘ব্রি-১০৫’ (ডায়াবেটিক ধান) সবচেয়ে ভালো। এই চালগুলোতে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) কম থাকে এবং ফাইবার বেশি থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়ায় না । স্বাভাবিক সাদা চাল বা মিনিকেট চালের বদলে ঢেঁকিছাঁটা বা লাল চাল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সেরা চালসমূহ:
- লাল চাল (Red Rice): এতে প্রচুর ফাইবার থাকে, যা সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- ব্রাউন রাইস (Brown Rice): এটি একটি হোল গ্রেইন যা পরিপাক ধীর করে
- বাসমতি চাল (Basmati Rice): এটি লো-জিআই (Low-GI) যুক্ত, যা সুগারের রোগীদের জন্য নিরাপদ
- ব্রি-১০৫ (BRRI dhan105): এটি ডায়াবেটিক চাল নামে পরিচিত, যাতে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম
- কালো চাল (Black Rice): এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবার সমৃদ্ধ ।
- কেরালা মাট্টা চাল (Kerala Matta Rice): এটিও একটি ফাইবার সমৃদ্ধ বিকল্প।
টিপস:
- ভাত সবসময় মেপে (১ কাপ) খাওয়া উচিত, যাতে অতিরিক্ত ক্যালোরি না যায় ।
- ভাতের সাথে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি এবং প্রোটিন (ডাল, মাছ) খেলে সুগার কম বাড়ে।
- প্রক্রিয়াজাত সাদা চাল বা বাসমতি চালের বদলে হোল গ্রেইন বা খোসাযুক্ত চাল বেছে নেওয়া ভালো।
এবার আসুন জেনে নিই-
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) ও গ্লুকোজ কি?
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) হলো একটি পরিমাপক পদ্ধতি, যা কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর কত দ্রুত রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা বাড়ে, তা ০ থেকে ১০০ স্কেলে নির্ধারণ করে। এটি মূলত ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থ থাকার জন্য খাবার নির্বাচনের একটি নির্দেশিকা।
গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মূল বিষয়সমূহ:
কম জিআই (Low GI - ৫৫ বা তার কম): খাবারগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে রক্তে গ্লুকোজ ছড়ায়, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে (যেমন- শাকসবজি, ডাল, ফল)।
মাঝারি জিআই (Medium GI - ৫৬-৬৯): এই খাবারগুলো সাধারণ গতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়।
উচ্চ জিআই (High GI - ৭০ বা তার বেশি): এই খাবারগুলো দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় (যেমন- সাদা ভাত, চিনি, পাউরুটি)।
গুরুত্ব:
কম জিআই সমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা—যেমন হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা এবং ওজনের ভারসাম্যহীনতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। খাবারের প্রক্রিয়াকরণ, রান্নার পদ্ধতি এবং আঁশযুক্ত খাবারের উপর জিআই মান নির্ভর করে।
গ্লুকোজঃ
গ্লুকোজ (\(C_{6}H_{12}O_{6}\)) হলো মানুষের শরীর ও কোষের প্রধান শক্তির উৎস এবং একটি সরল শর্করা বা মনোস্যাকারাইড। এটি রক্তের শর্করা হিসেবে পরিচিত, যা আমরা গ্রহণ করা শর্করাযুক্ত খাবার থেকে পাই এবং যা কোষে সরাসরি শক্তি সরবরাহ করে। এটি শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় এনার্জি বা শক্তি (ATP) তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করে।
গ্লুকোজ সম্পর্কে মূল তথ্য:
প্রকার: এটি একটি মনোস্যাকারাইড বা সরল চিনি।
সংকেত: এর আণবিক সংকেত \(C_{6}H_{12}O_{6}\)।
উৎস: মধু, মিষ্টি ফল এবং কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার (ভাত, রুটি)।
কাজ: কোষের কাজের জন্য দ্রুত শক্তি উৎপাদন করা।
সংরক্ষণ: অতিরিক্ত গ্লুকোজ যকৃত (Liver) এবং পেশীতে গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা থাকে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ইনসুলিন হরমোন, যা অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হয়।




