আষাঢ় মাসে কৃষক ভাইদের করণীয়
নববর্ষার শীতল স্পর্শে ধরণীকে শান্ত, শীতল ও শুদ্ধ করতে বর্ষা আসে আমাদের মাঝে। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা ভরে ওঠে নতুন জোয়ারে। গাছপালা ধুয়ে মুছে সবুজ প্রকৃতি মন ভালো করে দেয় প্রতিটি বাঙালির। সাথে আমাদের কৃষি কাজে নিয়ে আসে ব্যাপক ব্যস্ততা। প্রিয় কৃষক-কৃষাণী/ কৃষিজীবী ভাইবোন আসুন আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই আষাঢ় মাসে কৃষির করণীয় আবশ্যকীয় কাজগুলো।
১. ধান (বোরো, আউশ ও আমন)
- বোরো: বোরো ধান ফসলসহ রবি/২০২৫-২৬ মৌসুমে বিভিন্ন ফসলের সংরক্ষিত বীজ উঁচু ও সঠিক পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ সমূহ যাতে বৃষ্টিতে ভিজে বা অধিক আর্দ্রতায় নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
- আউশ:
- আউশ ধানের জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য যত্ন নিতে হবে।
- আউশ ধানের ক্ষেতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (IPM) মাধ্যমে রোগ ও বালাই দমন করতে হবে।
- বন্যার আশঙ্কা হলে আগাম রোপণ করা আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
- আমন:
- আমন ধানের বীজতলা তৈরির উপযুক্ত সময়। পানিতে ডুবে না এমন উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার কারণে রোপা আমনের বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকলে ভাসমান বীজতলা বা দাপগ পদ্ধতিতে বীজতলা করে চারা উৎপাদন করা যাবে।
- বীজতলায় বীজ বপন করার আগে ভাল জাতের সুস্থ সবল বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
- রোপা আমনের উন্নতজাত সমূহ হলো: ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান৯০, ব্রি ধান৯১, ব্রি ধান৯৩, ব্রি ধান৯৪, ব্রি ধান৯৫, ব্রি হাইব্রিডধান৬, বিনা ধান৮, বিনা ধান১৩, বিনা ধান১৫, বিনা ধান১৬, বিনা ধান২০, বিনা ধান২২।
- সুগন্ধি জাতসমূহ: ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৮০।
- জলমগ্নতা সহনশীল জাতসমূহ: ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, বিনা ধান১২।
- লবণাক্ততা সহনশীল: ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩, ব্রি ধান৭৮, বিনা ধান৮, বিনা ধান১০, বিনা ধান২৩।
- অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা অঞ্চলে চাষযোগ্য জাতসমূহ: ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭, ব্রি ধান৭৮।
- আকস্মিক বন্যা প্রবণ এলাকায় চাষযোগ্য: ব্রি ধান৭৯।
- খরাসহনশীল জাতসমূহ: ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, বিনা ধান১৭, বিনা ধান১৯।
- খরা প্রবণ এলাকাতে নাবি রোপা আমন ধানের পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমন ধানের জাত: ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, বিনা ধান৭ চাষ করতে পারেন।
- আষাঢ় মাসে রোপা আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করা যায়। জমিতে চারা সারি করে রোপণ করতে হবে। এতে পরবর্তী আন্তঃপরিচর্যা বিশেষ করে আগাছা দমন সহজ হবে। খরা ও লবণাক্ত এলাকায় জমির এক কোণে মিনি পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন, যেন পরবর্তীতে সম্পূরক সেচ নিশ্চিত করা যায়।
২. পাট
- পাট গাছের বয়স চার মাস হলে ক্ষেতের পাটগাছ কেটে নিতে হবে।
- পাট গাছ কাটার পর চিকন ও মোটা পাট গাছ আলাদা করে আঁটি বেঁধে দুই/তিনদিন দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে।
- পাতা ঝরে গেলে ৩/৪ দিন পাট গাছগুলোর গোড়া এক ফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিতে হবে।
- পাট পঁচে গেলে পানিতে আঁটি ভাসিয়ে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকাতে হবে।
- পাটের বীজ উৎপাদনের জন্য ১০০ দিন বয়সের পাট গাছের এক থেকে দেড় ফুট ডগা কেটে নিয়ে দু'টি গিটসহ ৩/৪ টুকরা করে ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাত করে রোপণ করতে হবে। রোপণ করা টুকরোগুলো থেকে ডালপালা বের হয়ে নতুন চারা হবে। পরবর্তীতে এসব চারায় প্রচুর ফুল ও ফল হবে এবং তা থেকে বীজ পাওয়া যাবে।
৩. ভুট্টা
- পরিপক্ক হওয়ার পর বৃষ্টিতে নষ্ট হবার আগে ভুট্টার মোচা সংগ্রহ করে ঘরের বারান্দায় সংগ্রহ করতে পারেন। রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- ভুট্টার মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা চাপ দিয়ে নিম্নমুখী করে দিতে হবে, এতে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।
৪. শাকসবজি
- এ সময়ে উৎপাদিত শাকসবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন। এসব সবজির গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিতে হবে।
- এছাড়া বন্যার পানি সহনশীল লতিরাজ কচুর আবাদ করতে পারেন। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘেরের পাড়ে গিমাকলমি ও অন্যান্য সবজি ফসল আবাদ করতে পারেন।
- সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
- তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরার জন্য বেশি বৃদ্ধি পাওয়া লতা জাতীয় গাছের ১৫-২০ শতাংশের লতাপাতা কেটে দিতে হবে। তবে মূল ডগার অগ্রভাগ কাটা যাবে না।
- কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাত পরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।
৫. ফল ও বৃক্ষ রোপণ
- ফলের চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করতে হবে। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী এক মিটার চওড়া ও এক মিটার গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম করে ডিএপি ও এমওপি সার মিশিয়ে, দিন দশেক পরে চারা বা কলম লাগাতে হবে। বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের রোগমুক্ত সুস্থ সবল চারা বা কলম রোপণ করতে হবে।
- চারা রোপণের পর শক্ত খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে দিতে হবে। এরপর বেড়া বা খাঁচা দিয়ে চারা রক্ষা করা, গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, সেচ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
- নার্সারিতে মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুব জরুরি। এ সময় সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, দুর্বল রোগাক্রান্ত ডালপালা কাটা বা ছেঁটে দেয়ার কাজ সুষ্ঠু ভাবে করতে হবে।
- এ সময় বনজ গাছের চারা ছাড়াও ফল ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে পারেন।
💡 বিশেষ পরামর্শ: তাছাড়া কৃষির যে কোন সমস্যায় উপজেলা কৃষি অফিস অথবা কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে বা কৃষক বন্ধু সেবার ৩৩৩১ নম্বরে কল করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে পারেন।
💡 কৃষকদের জন্য বিশেষ পরামর্শ:
কৃষকের ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন ও বালাইনাশক পরামর্শ দেখুন